সাংবাদিক আলিফ হত্যা: ২ সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা স্ত্রী, বিচার দাবি

স্বামীকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছেন স্ত্রী আনন্দিতা। মাত্র চার বছরের মেয়ে আর দেড় বছরের ছেলেকে নিয়ে এখন তার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
যে মানুষটিকে ঘিরে ছিল সংসারের সব স্বপ্ন, সেই মানুষটিই আর কখনো ফিরে আসবেন না। বাবার আদর-স্নেহ পাওয়ার বয়সেই দুই অবুঝ শিশুকে হারাতে হলো বাবাকে।
অন্যদিকে, সহকর্মী সাংবাদিক ও এলাকাবাসীর চোখে-মুখে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভ। তাদের একটাই দাবি, সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে সাংবাদিক আলিফ ফকির নিহত হওয়ার ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবার ও এলাকাজুড়ে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ।
একজন সাংবাদিককে এভাবে গুলি করে হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক নেতারাও। তারা বলছেন, এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলুঞ্জিয়া গ্রামে শ্বশুরবাড়ির সামনের একটি দোকানের কাছে সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
নিহত আলিফ ফকির বেসরকারি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনার রাতে আলিফ উৎরাইল বাজারের একটি দোকানে বসেছিলেন। পরে দোকান থেকে চলে যাওয়ার সময় ভুল করে নিজের মোবাইলফোনটি সেখানে ফেলে যান তিনি। ফোনটি নিতে আবার দোকানে ফিরে আসেন। এরপর ফোন নিয়ে চলে যাওয়ার সময় পেছন থেকে দুই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি আলিফকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় গুলিবিদ্ধ আলিফকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় স্বামী আলিফকে হারিয়ে স্ত্রী আনন্দিতার সামনে এখন শোকের পাশাপাশি দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার কঠিন বাস্তবতা। চার বছরের মেয়ে ও দেড় বছরের ছেলেকে নিয়ে কীভাবে সামনের দিনগুলো পার করবেন, কীভাবে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়বেন-এমন নানা চিন্তায় দিশেহারা তিনি।
যে বয়সে সন্তানদের বাবার হাত ধরে হাঁটার কথা, বাবার কোলে চড়ে আদর পাওয়ার কথা, সেই বয়সেই তারা হারিয়েছে তাদের বাবাকে। সন্তান দুটি হয়তো এখনো বুঝতে পারছে না, তাদের জীবনে কী অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু মা আনন্দিতার কাছে এই শূন্যতা সারা জীবনের।
স্বামীর এমন অপমৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি। তার কান্নার আড়ালে বারবার সামনে আসছে দুই সন্তানের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। স্বামী হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন তিনি।
আনন্দিতা বলেন, আমার স্বামীকে এভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে-আমি এখনো এই কষ্ট মেনে নিতে পারছি না। আমার দুটি ছোট ছোট অবুঝ বাচ্চা। মেয়েটার বয়স মাত্র চার বছর, আর ছেলেটার বয়স দেড় বছর। ওদের নিয়ে আমি কোথায় যাব, কী করব? ওদের ভবিষ্যৎ কী হবে? যে মানুষটি আমাদের সংসারের ভরসা ছিলেন, যাকে ঘিরে আমার এত স্বপ্ন ছিল, তাকেই আজ হারিয়ে ফেলেছি। আমার সন্তানদের মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া সরে গেল। ওরা এখনো এত ছোট যে বাবাকে হারানোর অর্থও ঠিকমতো বোঝে না। বড় হয়ে যখন বাবাকে খুঁজবে, তখন আমি কীভাবে ওদের বোঝাব যে তাদের বাবা আর কোনো দিন ফিরে আসবে না?
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, আমার স্বামী তো আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু আমি চাই না, তার হত্যাকারীরা শাস্তি ছাড়া পার পেয়ে যাক। যারা আমার সংসারটা এভাবে ভেঙে দিয়েছে, আমার সন্তানদের বাবাহারা করেছে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হোক। আমি আমার স্বামীর হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই। আমার সন্তানদের জন্য হলেও আমি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দেখে যেতে চাই। ওরা যেন একদিন বলতে পারে, তাদের বাবার হত্যার বিচার হয়েছে। আমার জীবনের এই শূন্যতা কেউ পূরণ করতে পারবে না, কিন্তু ন্যায়বিচার পেলে অন্তত মনে হবে, আমার স্বামীর প্রতি অন্যায়ের বিচার হয়েছে। আমি চাই, আর কোনো স্ত্রীকে এভাবে স্বামী হারাতে না হোক, আর কোনো শিশুকে এত অল্প বয়সে বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হতে না হোক।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ খান জানান, নিহত সাংবাদিকের মাথা, গলা, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির আঘাত পাওয়া গেছে। ঘটনার পর থেকেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযানও চলছে।
হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী কারণ রয়েছে, কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত এবং কেন আলিফকে হত্যা করা হলো-এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে অপেক্ষা করছেন নিহতের স্বজন, সহকর্মী সাংবাদিক ও এলাকাবাসী। তাদের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে এবং অপরাধীরা আইনের আওতায় আসবে।
সাংবাদিক আলিফকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দুর্গাপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ। তিনি বলেন, একজন সাংবাদিককে এভাবে হত্যা করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়। এ ঘটনা শুধু নিহতের পরিবারের জন্য নয়, পুরো সাংবাদিক সমাজের জন্য গভীর বেদনার।
মাসুম বিল্লাহ বলেন, সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত মানুষের কথা তুলে ধরেন। সমাজের নানা অসংগতি, অনিয়ম ও মানুষের অধিকার আদায়ের বিষয়গুলো গণমাধ্যমে প্রকাশ করেন। একজন সাংবাদিকের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের সবাইকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।



মন্তব্য করুন