প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ‘গণ-অভিশংসন’ শুরু করেছে ইন্ডিয়া ব্লক

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘গণ-অভিশংসন’ বা প্রতীকী অপসারণ কর্মসূচি পালন করেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ইন্ডিয়া (INDIA)। বিরোধীদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ভোট কারচুপি হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন বিজেপির নির্দেশে কাজ করছে। এ কারণে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা।
শনিবার দিল্লিতে আয়োজিত এই প্রতীকী অধিবেশনে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব উত্থাপন করেন। আর অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন লোকসভার সাবেক স্পিকার মীরা কুমার।
পুরো আয়োজনটি সাজানো হয়েছিল ভারতের পুরোনো সংসদ ভবনের সেন্ট্রাল হলের আদলে। সেখানে সংসদের মতো বসার ব্যবস্থা ও মঞ্চ তৈরি করা হয়। অধিবেশনে বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতা, মুখ্যমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ব্যক্তিরা অংশ নেন।
এদিকে এই কর্মসূচি নিয়ে বিরোধীদের কটাক্ষ করেছে বিজেপি। দলটির নেতারা বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধীকে উদ্দেশ করে বলেছেন, বাস্তব নির্বাচনে জিততে না পেরে তিনি এখন নিজের পছন্দমতো সংসদ তৈরি করে সেখানে বসছেন।
অধিবেশনের শুরুতে মীরা কুমার বলেন, ভোটারদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ভোটার তালিকা থেকে মানুষের নাম বাদ দেওয়া হলেও এর যথাযথ ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবিতে এই প্রতীকী প্রস্তাব আনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ রয়েছে। তাই নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
পরে প্রস্তাব উত্থাপন করে মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, গণতন্ত্রে ভোট দেওয়ার অধিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে সেই অধিকার হুমকির মুখে। তার অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজ করছেন।
খাড়গে আরও অভিযোগ করেন, ক্ষমতা ধরে রাখতে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের দলবদল, রাজনৈতিক দল ভাঙা, নির্বাচিত সরকার ফেলে দেওয়া, ইলেক্টোরাল বন্ড এবং কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে। এখন ভোট কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
অমিত শাহের চ্যালেঞ্জ
এর আগে শুক্রবার উত্তর প্রদেশের লখনউয়ে বিজেপির এক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিরোধীদের সংসদে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ভোটার তালিকা নিয়ে সংসদে আলোচনায় বসতে সরকার প্রস্তুত। এ বিষয়ে তাদের লুকানোর কিছু নেই। প্রয়োজনে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে আলোচনা করা যেতে পারে।
শাহের অভিযোগ, বিরোধীরা সংসদে আলোচনা না করে বাইরে বিক্ষোভ করছে এবং সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা দিচ্ছে।
মূলত কংগ্রেস প্রথমে একটি প্রতীকী সংসদ অধিবেশনের পরিকল্পনা করেছিল। পরে কর্মসূচিটির নাম দেওয়া হয় ‘গণ-অভিশংসন’। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবিতে বিরোধীদের দেওয়া প্রকৃত নোটিশ আগেই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এ ছাড়া এ ধরনের প্রস্তাব পাস করার মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাও বিরোধীদের নেই। বৃষ্টির কারণে শুক্রবারের নির্ধারিত কর্মসূচিও পিছিয়ে দেওয়া হয়।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ
ইন্ডিয়া জোটের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) বন্ধ করা এবং সংশোধনের আগের ভোটার তালিকা পুনর্বহাল করা।
বিরোধীদের দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা আগের মোট ভোটারের প্রায় ১৪ শতাংশ।
ভোটার তালিকা সংশোধনের এই বিষয়টি আগেও সংসদে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ২০২৫ সালের বর্ষাকালীন অধিবেশনে বিহারের এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের প্রতিবাদের কারণে সংসদের কার্যক্রম বারবার ব্যাহত হয়। অপারেশন সিঁদুর নিয়ে আলোচনা ছাড়া ওই অধিবেশনে সংসদের কাজও তুলনামূলক কম হয়েছিল।
পরে শীতকালীন অধিবেশনে সরকার এসআইআর নিয়ে সরাসরি বিতর্কের পরিবর্তে নির্বাচনী সংস্কার নিয়ে আলোচনায় সম্মত হয়। ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বরের সেই বিতর্কে রাহুল গান্ধী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে তার ‘ভোট চুরি’ সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে আলোচনার চ্যালেঞ্জ জানান। জবাবে শাহ বলেন, সংসদে কখন কোন বিষয়ে বক্তব্য দেবেন, তা তিনি নিজেই ঠিক করবেন। পরে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন।
এ ছাড়া গত এপ্রিলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে বিরোধীদের দেওয়া নোটিশও প্রত্যাখ্যান করেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সি. পি. রাধাকৃষ্ণন।
আগামী ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে ইন্ডিয়া জোটের বড় সমাবেশ হওয়ার কথা রয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলনের অংশ হিসেবেই এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। তবে আম আদমি পার্টি (আপ) জানিয়েছে, তারা এই জোটের অংশ নয়।



মন্তব্য করুন