পাঠাভ্যাসে সমৃদ্ধ হোক নতুন প্রজন্ম শ্লোগানকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক আবুসাঈদের ব্যাতিক্রমী উদ্যোগ।

বইয়ের আলোয় আলোকিত প্রজন্ম গড়তে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা প্রশাসক আবু সাঈদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। নিজেই ছুটছেন,খাল বিল আর প্রান্তর পেরিয়ে নয়টি উপজেলা সেখান থেকে কলেজ, মাদ্রাসা আর বিদ্যালয়ে,ছাত্র ছাত্রীদের সমাবেশে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন বই, যোগাচ্ছেন বইপড়ার প্রেরণা। জেলার ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর বইপড়া কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে একটা বিপ্লব ,রীতিমতো পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়েছে ৩৫০০ শিক্ষার্থীদের। তারপর জেলা পর্যায়ের চূড়ান্ত পর্বে ১৩৫ জন। আগামীকাল সেখান থেকে চুড়ান্তভাবে পাশ করবেন ১৫ জন। এভাবেই আপাততঃ সমাপ্তি ঘটবে প্রায় ৪ মাসব্যাপী চলা একটি রুপকথার অধ্যায়। একটি বই বদলে দিতে পারে একটি জীবন, আর বইপড়ায় অভ্যস্ত একটি প্রজন্ম বদলে দিতে পারে পুরো সমাজ—এমন প্রত্যাশাকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ।গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার আলোকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের প্রচলিত গণ্ডি পেরিয়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি গিয়ে শিক্ষার্থীদের বই পড়তে উৎসাহিত করছেন তিনি। তাঁর এ উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে জেলার ৪০০ স্কুল কলেজ মাদ্রাসার হাজারো শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক। বইকে আনন্দ, জ্ঞান ও মনন বিকাশের সঙ্গী করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘বইপড়া কর্মসূচি-২০২৬’।জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে অংশ নিয়েছে ২০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হয়ে পরবর্তী ধাপে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী। কয়েক ধাপের মূল্যায়ন ও বাছাই শেষে জেলা পর্যায়ের চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত হয়েছে ১৩৫ জন।শিক্ষার্থীদের বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে জেলা প্রশাসক আবু সাঈদের সরাসরি অংশগ্রহণ এ কর্মসূচির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলা, বই পড়ার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করার মধ্য দিয়ে তিনি এ উদ্যোগকে শিক্ষার্থীদের আরও কাছাকাছি নিয়ে গেছেন।বর্তমান সময়ে যখন ডিজিটাল মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নানা ধরনের বিনোদনের ভিড়ে শিশু-কিশোরদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে, তখন তাদের বইয়ের জগতে ফিরিয়ে আনার এই প্রচেষ্টা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ, বই পড়া কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার উপায় নয়; এটি মানুষের চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি, বিচারবোধ ও মানবিক চেতনা বিকাশের অন্যতম ভিত্তি।শিক্ষার্থীদের বইমুখী করতে জেলা প্রশাসক আবু সাঈদের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জ্ঞাননির্ভর ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা। একটি প্রতিযোগিতায় বিজয়ী তৈরি করার চেয়েও তাঁর এ কর্মসূচির বড় তাৎপর্য হলো—শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন একটি অভ্যাস তৈরি করা, যা তাদের সারা জীবন পথ দেখাবে।এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ বলেন “আমি চাই, আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, নিজেদের জানার পরিধি বাড়াতে, মানুষকে বুঝতে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বই,ছোট কাগজ, পত্রিকা পড়ুক। বই মানুষকে আলোকিত করে, চিন্তাশীল করে এবং মানবিক হতে শেখায়। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। তাদের হাতে বই তুলে দিয়ে যদি আমরা জ্ঞানমনস্ক, নৈতিক ও সৃজনশীল একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারি, সেটিই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। সে লক্ষ্যেই শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে তাদের বই পড়তে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছি।”শিক্ষার্থীদের শ্রেণি ও শিক্ষাস্তর বিবেচনায় ‘বইপড়া কর্মসূচি-২০২৬’ পরিচালিত হচ্ছে তিনটি বিভাগে। ক বিভাগে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি, খ বিভাগে নবম ও দশম শ্রেণি এবং গ বিভাগে একাদশ শ্রেণি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।প্রতিযোগিতার পাঠ্যসূচিতে রয়েছে বাংলা সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, বিজ্ঞান, জীবনী, শিশু-কিশোর সাহিত্য ও নৈতিক শিক্ষাবিষয়ক নির্বাচিত বই। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি বই উপস্থাপন ও বিশ্লেষণের বিষয়ও রাখা হয়েছে। ফলে মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে বই পড়ে বোঝা, নিজের ভাষায় প্রকাশ করা এবং অর্জিত জ্ঞান বিশ্লেষণের সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।২৭ অক্টোবর সোমবার জেলা প্রশাসক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বই পড়া প্রতিযোগিতা ৪ আগস্ট ২০২৬ কর্মসূচিটির উদ্বোধন করা হয়। পরে ৩০ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন ধাপের প্রতিযোগিতা ও বাছাই শেষে আগামী ২৮ অক্টোবর জেলা পর্যায়ের চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।চূড়ান্ত পর্বে নির্বাচিত ১৩৫ জন শিক্ষার্থী নিজেদের জ্ঞান, অনুধাবন, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও সৃজনশীল চিন্তার পরিচয় দেওয়ার সুযোগ পাবে। জেলা পর্যায়ে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিভাগ থেকে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের তাদের পছন্দের বই, প্রাইজ বন্ড, ক্রেস্ট, সার্টিফিকেট ও অন্যান্য পুরস্কার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা পর্যায়ে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সনদ প্রদান করা হবে। একটি বই একজন শিক্ষার্থীর চিন্তার দুয়ার খুলে দিতে পারে; আর হাজারো শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দেওয়ার উদ্যোগ আলোকিত করতে পারে একটি জেলার ভবিষ্যৎ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বইপড়া কর্মসূচি-২০২৬’ তাই কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়—এটি বইয়ের আলোয় জ্ঞানমনস্ক, মানবিক ও সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রত্যাশারও প্রতিচ্ছবি।

একটি বই হাজারো বন্ধুর চেয়ে উত্তম। পাঠভ্যাস সেই মানুষকে সকল অপরাধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে।সেরা পাঠকের খোঁজে যেই অভিযান শুরু হয়েছে তার সমাপ্তি ঘটবে আগামী ৩১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ বিকাল তিনটায় নিয়াজ মুহম্মদ স্টেডিয়ামে। প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করবেন আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রতিমন্ত্রী সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল এমপি,ড. মোঃ জিয়াউদ্দিন কমিশনার চট্টগ্রাম বিভাগ, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম, মহা পরিচালক, বাংলা একাডেমি, সিরাজুল ইসলাম, প্রশাসক – জেলা পরিষদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মু. জালাল উদ্দিন ফাহিম, পুলিশ সুপার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আফসানা বেগম, পরিচালক, জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র, শরিফুল ইসলাম, প্রশাসক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন কথাসাহিত্যিক ও জেলা প্রশাসক ব্রাহ্মণবাড়িয়া মোঃ আবুসাঈদ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সকল পড়ুয়াদের মিলনমেলায় সবাইকে সাদর আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ( শিক্ষা ও আইসিটি) মোঃ আবু তালেব, সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (শিক্ষা ও কল্যাণ শাখা, আইসিটি শাখা) মোঃ শরীফুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি জাবেদ রহিম ও জেলা পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইব্রাহিম খান সাদাত সহ গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।



মন্তব্য করুন