বাংলাদেশ ▣ ই-পেপার
সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকা মেডিকেল কলেজ বাথরুমে তরুণীর মরদেহ, রক্তমাখা  ছুরি ঘিরে রহস্য

October 5, 2026 Ibrahim Khan Sadat 0 মন্তব্য 32 বার পঠিত

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের একটি বাথরুম থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর রক্তাক্ত ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে শাহবাগ থানা পুলিশ। আনুমানিক ২৮ বছর বয়সী ওই নারী আত্মহত্যা করেছেন নাকি তাকে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত করতে পারেনি কেউ। তবে মরদেহ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের কনফারেন্স রুমের দ্বিতীয় গেটের সামনে একটি রক্তমাখা ফল কাটার ছুরি এবং আশপাশে রক্তের দাগ পাওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে।

সোমবার (৫ অক্টোবর) সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে ঢামেক হাসপাতালের ১১০ ও ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝামাঝি স্থানে থাকা বাথরুমের ৪ নম্বর কক্ষ থেকে ওই নারীর মরদেহ পাওয়া যায়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সকাল ১০টার দিকে দৈনিক ভিত্তিতে কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাহমুদ শেখ বাথরুম পরিষ্কার করতে যান। নিয়ম অনুযায়ী তিনি ভেতরের কক্ষগুলোর দরজায় নক করে অবস্থানকারীদের বের হয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তবে ৪ নম্বর কক্ষের দরজায় একাধিকবার নক করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। পরে সন্দেহ হলে মাহমুদ শেখ তার সহকর্মী রাসেল ও কামালকে ডেকে আনেন। একপর্যায়ে দরজা খোলা হলে ভেতরে ওই নারীকে রক্তাক্ত ও ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তারা। পরে বিষয়টি আনসার সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। খবর পেয়ে শাহবাগ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।

পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাহমুদ শেখ বলেন, ৪ নম্বর কক্ষটির দরজা ভেতর থেকে আটকানো ছিল। পরে ঝুলন্ত অবস্থায় ওই নারীকে দেখার পর তারা দ্রুত আনসার সদস্য ও সর্দারকে বিষয়টি জানান।

কনফারেন্স রুমের সামনে রক্তাক্ত ছুরি

মরদেহ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে একই দিন ভোরে হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের কনফারেন্স রুমের দ্বিতীয় গেটের সামনে রক্তমাখা একটি কালো স্টিলের ফল কাটার ছুরি পড়ে থাকতে দেখা যায়। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাশী সন্তোষ প্রথম ছুরিটি দেখতে পান।

সন্তোষ জানান, রক্তভেজা অবস্থায় ছুরিটি পড়ে থাকতে দেখে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে তিনি ওই স্থান পরিষ্কার করেন। পরে ছুরিটি ধুয়ে নিজের কাছে রেখে দেন। ঘটনার চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর ১১০ ও ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের বাথরুমে একজনের মরদেহ পাওয়ার কথা জানতে পারেন তিনি। তবে তিনি ওই নারীকে সরাসরি দেখেননি।

ঢামেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. শায়লা ফেরদৌস আহসান জানান, সকালে হাসপাতালে এসে তিনি বাথরুমে ঝুলন্ত মরদেহের খবর পান। পরে কনফারেন্স রুমের সামনে রক্ত ও ছুরি উদ্ধারের বিষয়টিও সামনে আসে।

তিনি বলেন, সকাল ৮টার আগে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা ডিউটি হস্তান্তরের সময় কনফারেন্স রুমের সামনে রক্তাক্ত ছুরিটি দেখতে পান। তারা স্টাফ ও ক্লিনার সন্তোষকে ডেকে জায়গাটি পরিষ্কার করতে বলেন। হাসপাতালে প্রতিদিন প্রচুর রোগী আসায় অনেক সময় মেঝেতে রক্ত পড়ে থাকে। ফলে শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, কোনো রোগী বা সংঘর্ষের কারণে এই রক্ত পড়তে পারে। পরে ক্লিনার মেঝে পরিষ্কার করেন।

সহকারী পরিচালক আরও বলেন, কনফারেন্স রুমের দ্বিতীয় গেটের সামনে ফোঁটা ফোঁটা রক্তের দাগ ছিল। ওই এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এতে ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট ও পুলিশের সদস্যরা রয়েছেন। সিআইডি মরদেহ ও আশপাশের আলামত সংগ্রহ করছেন।

পুলিশের একটি সূত্র থেকে জানা যায়, গত রাত থেকে আমরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখা শুরু করেছি। পানির লাইনের সঙ্গে তার গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় এবং তার বাম হাত ধরানো অস্ত্র দিয়ে কাটা অবস্থায় পাই। ঘটনাটি দেখে মনে হচ্ছে এটি একটি হত্যাকাণ্ড। সিসিটিভি ফুটে যাচাই এবং আলামত সংগ্রহের পর আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এদিকে ওই নারীর ব্যাগে থাকা ডাচ বাংলা ব্যাংকের একটি ব্যাংকের কাগজ পাওয়া যায়। ওই ব্যাংক ডকুমেন্টে তন্ময় মণ্ডল নামে একজনের নাম পাওয়া যায়। সেটির ছবি এসেছে ঢাকা পোস্টের হাতে। সেখানে লেখা রয়েছে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হসপিটাল ১২২ কাজী নজরুল ইসলাম শাহবাগ ঢাকা। ওই মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামে ঢাকা পোস্ট। পরবর্তীতে ওই মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে তার জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হয়। জাতীয় পরিচয়পত্রের ওই নারীর নাম লেখা রয়েছে ঝুমা রানী দে। তার বাবার নাম পরিমল চন্দ্র দে ও মায়ের নাম ববিতা রানী দে। তার জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৯৬। বর্তমানে ঝুমা রানী দে এর বয়স প্রায় ৩১ বছর। জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর-৪২০২৬…৬৯। ওই জাতীয় পরিচয়পত্রে তার ঠিকানা দেখা যায় রমনা থানার শান্তিনগর টি এস গাবতলা জাহাববক্স লেন এলাকায়। তন্ময় মণ্ডলের খোঁজ নিয়ে জানা যায় তিনি ইব্রাহিম কার্ডিয়াকের একজন কর্মচারী।

এদিকে উদ্ধার হওয়া ডাচ-বাংলা ব্যাংকের স্লিপে পাওয়া মোবাইল নম্বরে ফোন করা হলে অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজের নাম তন্ময় মণ্ডল নয় বলে জানান। তিনি নিজেকে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ কামাল হোসেন পরিচয় দিয়ে বলেন, মোবাইলটি বর্তমানে আমার হেফাজতে রয়েছে। তবে এই মোবাইল ফোনের মালিক পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, তদন্তের স্বার্থে এখনই এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।

শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, খবর পেয়ে আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই। পরে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিটও ঘটনাস্থলে আসে। পরে সেখান থেকে তারা আলামত সংগ্রহ করেছে। তার ব্যাগে পাওয়া একটি চিরকুট পাওয়া যায় সেখানে তন্ময় মণ্ডল লেখা পাওয়া যায় এবং একটি ব‍্যাংক ডকুমেন্ট পাওয়া যায় সেখানে তন্ময় মণ্ডল লেখা পাওয়া যায়। আমরা প্রাথমিকভাবে ওই নারীর নাম পেয়েছি ঝুমা রানী দে তবে এখনো কনফার্ম হতে পারিনি।

এই ঘটনায় তন্ময় মণ্ডল নামে কেউ আটক আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এরকম কেউ আমাদের কাছে আটক নেই। তিনি আরও বলেন, মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনাস্থল ও আশপাশের আলামত সংগ্রহ এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা চলছে।

সংবাদটি শেয়ার করুনআপনার পছন্দের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিন
Facebook X WhatsApp Telegram
পাঠকের মতামত

মন্তব্য করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *