বাংলাদেশ ▣ ই-পেপার
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

নাসিরনগরে শুঁটকি শিল্পের, সম্ভাবনা থাকলেও অবহেলায় জেলেরা

November 2, 2026 Ibrahim Khan Sadat 0 মন্তব্য 4 বার পঠিত

মোঃ আব্দুল হান্নান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের প্রায় ৩০ কিঃমিঃ উত্তরে হাওড়বেষ্টিত এক জনপদের নাম নাসিরনগর।সেখানে রয়েছে অসংখ্য খাল বিল পুকুর ডোবা বড় বড় নদনদী সহ অসংখ্য জলাশয়।বর্ষার পানি কমতে শুরু করলেই নাসিরনগরের জেলে পাড়ায় শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। জলাশয় থেকে পুঁটি মাছ সংগ্রহ, বাছাই,পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং প্রক্রিয়াজাত করে রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে জেলেপাড়ার নারী-পুরুষরা। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পেশা এখন শুধু তাদের জীবিকার অবলম্বন নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতেো একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

নাসিরনগরের জেলে পাড়ায় বর্ষার শেষভাগ থেকে শুরু হয় পুঁটি মাছের শুঁটকি তৈরির কাজ। এ সময় জলাশয়ের পানি কমতে থাকলে পুঁটি মাছ সংগ্রহের সুযোগ বাড়ে। সংগৃহীত মাছ বিভিন্ন ধাপে প্রক্রিয়াজাত করে বিশেষ পদ্ধতিতে মাচায় সাজিয়ে রোদে শুকানো হয়। নিয়মিত পরিচর্যা ও উল্টেপাল্টে দেওয়ার মাধ্যমে মাছগুলো ভালোভাবে শুকিয়ে তৈরি করা হয় পুঁটি মাছের চ্যাপা শুঁটকি।

স্থানীয় উৎপাদকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর এ মৌসুমে তারা নদীর পাড়ে বাঁশের মাচা তৈরি করে।আর মাচাতে প্রতি মাসে প্রায় ২শ মণ শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করা হয়। বর্তমানে বাজারে আকার ভেদে প্রতি মন শুটকির মূল্য প্রায় ২৪ হাজার থেকে ২৮ হাজার টাকা । ফলে মৌসুমজুড়ে এ পেশাকে ঘিরে নাসিরনগরের জেলে পাড়ায় তৈরি হয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক ব্যস্ত পরিবেশ।

শুঁটকি তৈরির প্রতিটি ধাপেই রয়েছে শ্রম ও সময়। মাছ সংগ্রহ থেকে শুরু করে বাছাই,পরিষ্কার, মাচায় সাজানো, রোদে শুকানো এবং সংরক্ষণ—সব কাজেই যুক্ত থাকে নারী ও পুরুষ। পরিবারের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে এ কাজে অংশ নেন। ফলে একদিকে যেমন পারিবারিক কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে মৌসুমী ভিত্তিতে বহু মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ এ পেশার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ঘরের কাজের পাশাপাশি শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণে যুক্ত হয়ে তারা পরিবারের আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব কৌশল কাজে লাগিয়ে তারা এ ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।

শুঁটকি উৎপাদনে বাজারমূল্য ভালো থাকলেও উৎপাদকদের লাভের হিসাব সব সময় অতাশাব্যঞ্জক। স্থানীয়দের মতে, মাছ সংগ্রহ, শ্রমিকের মজুরি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, শুকানোর জায়গা, পরিবহন ও সংরক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য ব্যয় রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা। বৃষ্টি কিংবা অতিরিক্ত আদ্রতায় মাছ ঠিকমতো শুকাতে না পারলে পণ্যের মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কয়েকজন উৎপাদক জানান, শুঁটকির বাজারমূল্য তুলনামূলক ভালো হলেও উৎপাদন খরচ ও শ্রমের হিসাব মেলাতে গিয়ে লাভের অংশ খুব বেশি থাকে না। ফলে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও কঠোর পরিশ্রমের পরও অনেক সময় প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায় না।

নাসিরনগরের জেলে সম্প্রদায়ের কাছে পুঁটি মাছের শুঁটকি উৎপাদন কেবল একটি ব্যবসা নয়; এটি তাদের বংশপরম্পরায় চলে আসা ঐতিহ্য ও জীবনসংগ্রামের অংশ। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে এই পেশাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ সৃষ্টি হয়। মাছ সংগ্রহকারী, শুঁটকি প্রস্তুতকারী, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে গড়ে ওঠে পারস্পরিক নির্ভরশীল একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে এ খাত থেকে আরও বেশি আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা, উন্নত শুকানোর প্রযুক্তি, মানসম্মত সংরক্ষণাগার এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে উৎপাদনের মান ও পরিমাণ দুটোই বাড়ানো সম্ভব।

সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং দেশের বিভিন্ন বাজারে বিপণনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও উপযুক্ত মোড়কজাতকরণের মাধ্যমে নাসিরনগরের পুঁটি মাছের শুঁটকিকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দেওয়া সম্ভব। এতে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বৃহত্তর বাজারেও এর চাহিদা তৈরির সুযোগ রয়েছে।

সম্ভাবনাময় এইৃ শুঁটকি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। উৎপাদকদের জন্য প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, আধুনিক প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি শুকানোর স্থান এবং স্থায়ী বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এ খাতের চিত্র বদলে যেতে পারে।

বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে পারিবারিক পর্যায়ের এই উৎপাদন কার্যক্রম আরও সংগঠিত শিল্পে রূপ নিতে পারে।

নাসিরনগরের জেলে পাড়ার মানুষের হাত ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে পুঁটি মাছের শুঁটকি তৈরির ঐতিহ্য। তাদের শ্রম, অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এই শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, সংরক্ষণব্যবস্থা ও বাজারজাতকরণের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে নাসিরনগরের এই ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্প হয়ে উঠতে পারে গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত।

নাসিরনগরের চ্যাপা শুটকি উৎপাদনকারীদের জীবণমান উন্নয়নে মৎস্য অধিদ্প্তরের কি ধরনের পদক্ষেপ রয়েছে জানতে চাইলে উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারন কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ জানান বর্তামানে নেই।তিন বছর পূর্বে ছিল।জাতীসংঘের এফইউ নামক একটি প্রকল্প আশুগঞ্জে কাজ করছে।সেখানে লালপুরে অনেকটি চ্যাপা শুটকি তৈরির মাচা রয়েছে।আমরাও নাসিরনগরকে এই আওতায় আনার জন্য প্রস্তাব পাটিয়ে রেখেছি।

সংবাদটি শেয়ার করুনআপনার পছন্দের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিন
Facebook X WhatsApp Telegram
পাঠকের মতামত

মন্তব্য করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *