বাংলাদেশ ▣ ই-পেপার
রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী তুরস্ক

June 5, 2026 Ibrahim Khan Sadat 0 মন্তব্য 42 বার পঠিত

বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তুরস্ক। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে ঢাকা ও আঙ্কারা।

এছাড়া বাণিজ্য ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার বিষয়ে আলোচনা করেছে দুদেশ।

 

আজ শুক্রবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান-এর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেন।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং এ বিষয়ে উভয় পক্ষ ইতোমধ্যে আলোচনা করেছে।

বৈঠকে দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও মতবিনিময় হয়েছে।

 

বাংলাদেশ সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে হাকান ফিদান বলেন, ‘এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমার সফরের চতুর্থ ও শেষ গন্তব্য বাংলাদেশ। এখানে আসতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং তাঁর প্রতিনিধিদলের উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।’

 

তিনি ড. খলিলুর রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, এই নির্বাচন বাংলাদেশের নতুন যুগের বৈশ্বিক প্রভাবের প্রতিফলন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেশের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।

হাকান ফিদান বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোটের পর বাংলাদেশ শান্তি ও স্থিতিশীলতার একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। তুরস্ক এ প্রক্রিয়াকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে।

তিনি বলেন, গত মার্চে ড. খলিলুর রহমানের তুরস্ক সফর এবং আনতালিয়া কূটনৈতিক ফোরামে তাঁর অংশগ্রহণ দুই দেশের সম্পর্ক গভীর করার যৌথ আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ।

সংবাদ সম্মেলনে তুরস্ক ও বাংলাদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়টিও তুলে ধরেন হাকান ফিদান। তিনি বলেন, এ চুক্তি দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।

রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। দেশটি ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে মানবতার জন্য এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করছে। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত সমাধানে তুরস্ক প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পক্ষে তুরস্কের অবস্থান অব্যাহত থাকবে।

হাকান ফিদান জানান, তিনি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যাবেন। সেখানে তুরস্কের বিভিন্ন সংস্থা, যেমন টিকা (টিআইকেএ), আফাদ, তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট ও দিয়ানেত ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম এবং তুরস্ক পরিচালিত ফিল্ড হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই দেশের আলোচনায় অগ্রগতি হওয়াকে তুরস্ক স্বাগত জানায় এবং এ থেকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার আশা করে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি। এ সময় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করার উদ্যোগকে মূল্যবান উল্লেখ করে তুরস্কের সমর্থনের কথাও জানান হাকান ফিদান।

গাজা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি ইজরায়েলের সমালোচনা করেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের কারণে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গাজায় ইজরায়েলের চলমান হত্যাযজ্ঞ ও পশ্চিম তীরে বিভিন্ন পদক্ষেপ আঞ্চলিক শান্তির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।

অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ও তাঁর প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশে স্বাগত জানাতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। তিনি স্মরণ করেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর ছিল তুরস্কে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে তুরস্কের প্রতিনিধি পাঠানো এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতার প্রতি আঙ্কারার সমর্থনের জন্য ঢাকা কৃতজ্ঞ।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ দর্শনের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। এই নীতি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। একই সঙ্গে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমতা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

ড. খলিলুর রহমান বলেন, হাকান ফিদানের এই সফর দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বের পর্যায়ে উন্নীত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) নিয়ে আলোচনা চলছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য তুর্কি উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এমনকি তুরস্কের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বস্ত্রশিল্প, প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ঢাকায় আন্তর্জাতিক মানের একটি হাসপাতাল ও নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব তুরস্ককে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তুরস্কে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্তমানে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশি নাগরিক তুরস্কে অবস্থান করছেন।

রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে ড. খলিলুর রহমান বলেন, নিরাপদ, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য। এ বিষয়ে তুরস্কের মানবিক ও কূটনৈতিক সহায়তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিশেষ করে কক্সবাজারে পরিচালিত তুরস্কের হাসপাতালকে তিনি রোহিঙ্গাদের জন্য অন্যতম সেরা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বাংলাদেশ তুরস্কের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, পারস্পরিক আস্থা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।

সংবাদটি শেয়ার করুনআপনার পছন্দের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিন
Facebook X WhatsApp Telegram
পাঠকের মতামত

মন্তব্য করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *