বাঙালি জাতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে এক বহুমুখী প্রতিভাকে—শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, সাহিত্য সমালোচক, ভাষাবিজ্ঞানী এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী আবু নয়ীম মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরীকে। তাঁর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে এই আলোচনা অনিবার্য যে, তাঁর জীবন, কর্ম ও আদর্শিক অবস্থান আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে কতটা প্রাসঙ্গিক। ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী আল-বদর কর্তৃক অপহৃত ও শহীদ হন। এক শতাব্দী পেরিয়েও তাঁর উত্তরাধিকার কেবল স্মারক নয়, বরং এক অপ্রতিরোধ্য চেতনার প্রতীক।
মুনীর চৌধুরীর প্রাসঙ্গিকতা বহুস্তরীয়, যা তাঁর আপোসহীন ব্যক্তিত্ব এবং সমাজ ও ভাষার প্রতি তাঁর গভীর অঙ্গীকারে নিহিত। ছাত্রজীবনেই বামপন্থী রাজনীতিতে দীক্ষিত হয়ে তিনি শোষণের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ান। তবে তাঁর জীবনের মূল মন্ত্র ছিল ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে আপোসহীনতা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা, কারাবরণ এবং কারাগারে বসেই কালজয়ী নাটক কবর রচনা—এই তিনটি ঘটনা তাঁকে জাতীয় আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। বর্তমানে যখন বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির প্রভাবে মাতৃভাষা ও দেশীয় সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন মুনীর চৌধুরীর সেই আপোসহীনতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ভাষা কেবল আবেগ নয়, এটি জাতীয় অস্তিত্বের ভিত্তি। সংস্কৃতি রক্ষায় তিনি পাকিস্তানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন—রবীন্দ্রনাথের গান প্রচারের নিষেধাজ্ঞা (১৯৬৭) এবং বাংলা বর্ণমালাকে রোমান হরফে সংস্কারের উদ্যোগের (১৯৬৮) বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করে—তা আজও আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জোগায়। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে পাকিস্তান সরকারের দেওয়া সিতারা-ই-ইমতিয়াজ খেতাব বর্জন করে তিনি প্রমাণ করেন যে, ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় সম্মানই মুখ্য। এই নৈতিক দৃঢ়তা আজকের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিরল ও অনুকরণীয়।
নাট্যকার হিসেবে মুনীর চৌধুরী বাংলা সাহিত্যে আধুনিক নাটকের দিগন্ত উন্মোচন করেন। তিনি ১৯৪৭-পরবর্তী বাংলাদেশের নাট্যজগতের আধুনিকায়নের অন্যতম পুরোধা পুরুষ। তাঁর নাটকগুলো জীবনঘনিষ্ঠ, সমাজ-সচেতন এবং রাজনৈতিক চেতনায় সমৃদ্ধ। কবর নাটকটি আজও একুশে ফেব্রুয়ারির মৃত্যুঞ্জয়ী চেতনার সবচেয়ে শক্তিশালী শিল্পভাষ্য হিসেবে বিবেচিত। এই নাটকের মাধ্যমে তিনি কীভাবে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণমানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা যায়, তার অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের পটভূমিকায় রচিত রক্তাক্ত প্রান্তর (১৯৫৯) নাটকে তিনি যুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে মানবতার জয়গান গেয়েছেন। তাঁর এই যুদ্ধবিরোধী মানবিক আবেদন আজকের বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা সংঘাত ও অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে গভীর প্রাসঙ্গিকতা বহন করে। দণ্ডকারণ্য, চিঠি বা বার্নার্ড শর কেউ কিছু বলতে পারে না (অনুবাদ) নাটকের মাধ্যমে তিনি তীক্ষ্ণ রসবোধ ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সমকালীন শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজের অন্তঃসারশূন্যতা ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মী ও সাহিত্য শিক্ষার্থীদের কাছে আধুনিক আঙ্গিক ও গভীর জীবনবোধের পাঠ হিসেবে বিবেচিত।
মুনীর চৌধুরী কেবল শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ ভাষাবিজ্ঞানী এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রযুক্তি-চিন্তক। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে তিনি কেবল অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। বাংলা ভাষার প্রায়োগিক উন্নতির জন্য তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো ‘মুনীর অপ্টিমা’ (১৯৬৫) নামক উন্নতমানের বাংলা টাইপরাইটারের কি-বোর্ড উদ্ভাবন। এমন একটি সময়ে যখন বাংলা ভাষার প্রযুক্তিগত ব্যবহার ছিল প্রায় অনুপস্থিত, তখন তিনি এই উদ্ভাবনটি করেন। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এসে যখন বাংলা কি-বোর্ড, ফন্ট ও সফটওয়্যার নিয়ে নিরন্তর কাজ চলছে, তখন মুনীর অপটিমা-এর প্রবর্তন মুনীর চৌধুরীর প্রযুক্তিবান্ধব মানসিকতা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার চিন্তাধারার সাক্ষ্য বহন করে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, একজন ভাষাবিজ্ঞানীকে অবশ্যই ভাষাটির প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পথপ্রদর্শক হতে হবে।
শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন ছাত্রদের কাছে এক প্রাণবন্ত প্রেরণা। তিনি তাঁর সাম্য ও ন্যায়ের প্রতি বিশ্বাস ছাত্রদের মধ্যেও সঞ্চারিত করতে চেয়েছেন। আবদুল্লাহ আল মামুন, মমতাজউদ্দীন আহমেদ, রামেন্দু মজুমদার ও সেলিম আল দীনের মতো খ্যাতিমান নাট্যব্যক্তিত্ব তাঁর কাছেই নাটকের দীক্ষা লাভ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য তাঁর বারবার প্রস্তাব উত্থাপনের ঘটনাটি আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক। বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি ‘রক্ষণশীলতার শেষ দুর্গ’ আখ্যা দিয়ে এই দুর্গ ভেঙে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের আহ্বান জানান। বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করার যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তাতে তাঁর সেই প্রত্যয়ী আহ্বান একবিংশ শতকের শিক্ষাবিদ ও নীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
মুনীর চৌধুরীর জীবনবোধ ছিল উদার মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় পুষ্ট। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ এবং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের সাম্য ও অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় মূলত তাঁর এই অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক আদর্শের কারণেই। তাঁর এই আদর্শিক জীবন ও শাহাদাতই বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। মুনীর চৌধুরীর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে, দেশে যখন মাঝে মাঝে সাম্প্রদায়িকতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন তাঁর বিদ্রোহের অমিত সাহস, চিরন্তন সাম্যের বোধ এবং মহাজাতকীয় প্রেম আমাদের জন্য ঐক্য, সহনশীলতা ও ন্যায়ের পথ বাতলে দেয়।
মুনীর চৌধুরীর প্রাসঙ্গিকতা কোনো গতানুগতিক আলোচনা নয়, এটি আমাদের জাতীয় জীবনের এক নিরন্তর আত্মসমীক্ষা। তাঁর নাটকের অগ্নিগর্ভ সংলাপ, তাঁর প্রযুক্তিগত দূরদৃষ্টি এবং তাঁর আদর্শিক জীবন—সবকিছুই প্রমাণ করে যে মুনীর চৌধুরী ছিলেন অগ্নীশ্বর এক বিজয়ীরূপে, যিনি তাঁর কর্মের মধ্যে দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রাণের প্রবাহ সঞ্চার করে চলেছেন। তাঁর এই অপ্রতিরোধ্য উত্তরাধিকার আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায়।
আলমগীর মোহাম্মদ
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অনুবাদক
