দিল্লিতে বিক্ষোভ-ইন্টারনেট-মেট্রোরেল চালু, ব্যারিকেড সরাতে সরকারকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ

দিল্লিতে মেট্রো ও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং ইন্টারনেট পরিষেবা চালু রাখার নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যারিকেড ও নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নিতে এবং সাংবাদিক ও আইনজীবীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
রোববার দুপুরে বিশেষ বেঞ্চে শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ এসব নির্দেশ দেন। দিল্লি পুলিশ, দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি)সহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে নোটিশ জারি করে জবাব তলব করেছেন আদালত। মামলার পরবর্তী শুনানি মঙ্গলবার। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে হলফনামা দিয়ে জানাতে হবে, তাদের বিরুদ্ধে কেন আদালত অবমাননার ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
শুনানিতে আদালত বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রয়োজনে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। তবে অকারণে সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা দেওয়া উচিত নয়। সুপ্রিম কোর্টের আশপাশে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা জারির বিষয়টি উঠে এলে ওই বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন বিচারপতিরা।
প্রধান বিচারপতি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের বাইরে বিএনএসএসের ১৬৩ ধারা জারির যে বোর্ড রয়েছে, তা সরিয়ে ফেলতে হবে, যাতে ন্যায়বিচারের পথে কোনো বাধা সৃষ্টি না হয়। বিচারপতি ভি মোহনা বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা যেতে পারে, তবে আইন ভঙ্গ করা যাবে না।
জাতীয় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন ঘিরে দিল্লি সম্পূর্ণ বন্ধ না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্ট। অভিযোগ, শুক্রবার প্রশাসন সেই নির্দেশ মানেনি। বন্ধ রাখা হয় ৪৫টি মেট্রো স্টেশন এবং বাতিল হয় শতাধিক ট্রেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনজীবী ত্রিপাঠী ও মেনকা গুরুস্বামী আদালত অবমাননার মামলা করেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন, দিল্লি পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমার এবং ডিএমআরসি চেয়ারম্যান ডি থারারের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে আদালতের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাকে বলেন, ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধের পর আদালত নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরপরও ৪৫টি স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে কেন, তা জানাতে হবে। বন্ধ স্টেশনগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ও গুরুত্ব তুলে ধরে একটি মানচিত্র মঙ্গলবারের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন ।
শুনানিতে আইনজীবীদের হেনস্থা ও আটকের বিষয়টিও উঠে আসে। আইনজীবী শাদান ফারাসত জানান, শনিবারের বিক্ষোভ চলাকালে আমাকে হেনস্থা করা হয় এবং চলন্ত বাস থেকে ছুড়ে ফেলা হয়। এ ঘটনা আইনজীবীদের অধিকার লঙ্ঘনের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর মতে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার এখন প্রতিটি নাগরিকের প্রশ্ন।
আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী অভিযোগ করেন, কয়েকজন সাংসদকে আটক করে সারা শহরে প্রিজন ভ্যানে ঘোরানো হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় কতজনকে বেআইনিভাবে আটক করা হয়েছে, তা জানা যায়নি বলেও দাবি করেন। চারজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সাংসদকে আটকের কথাও উল্লেখ করেন এই আইনজীবী।
মেনকা গুরুস্বামী বলেন, জরুরি অবস্থা ছাড়া সংবিধানস্বীকৃত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও মিছিলের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের শোকজ করে আদালতে হাজির করার এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন জানান। এ ঘটনা শুধু সুপ্রিম কোর্টের অবমাননা নয়, সংবিধানেরও অবমাননা।
জবাবে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, মেট্রো ও ট্রেন চলাচল চালু রয়েছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনের প্রবেশপথ বন্ধ রাখতে হয়েছে। ইন্টারনেট পরিষেবাও চালু রয়েছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের আশপাশে বিএনএসএসের ১৬৩ ধারা জারি থাকার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলতে হবে বলে জানান।
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী পর্যবেক্ষণে বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার সংবিধানস্বীকৃত হলেও তা নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে, তবে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে কাউকে বেআইনিভাবে আটক করা যাবে না। রাজধানীতে মেট্রো ও রেল পরিষেবা এবং ইন্টারনেট স্বাভাবিক রাখতে হবে। প্রতিবাদের অধিকার সবার, তবে তা আইন মেনে পালন করতে হবে।



মন্তব্য করুন